রক্তপ্রাণ || মানবিক গল্প || মোঃ সাব্বির হোসেন
মা, ওমা, তুমি চিন্তা কইরো না, তুমি ঠিক হইয়া যাইবা। এইতো মা আমরা হাসপাতালে চলে আসছি মা। আর একটু ধৈর্য ধর মা আমরা আইসা পরছি। আর মাত্র পাচ মিনিট মা। একটু পরেই তোমাকে অনেক বড় ডাক্তার চিকিৎসা করবে মা। তুমি একদম সুস্থ হয়ে যাবে মা। একটু ধৈর্য ধর মা।
এম্বুল্যান্সে শুয়ে থাকা শাকিলের অসুস্থ মায়ের পাশে বসে হাতটি ধরে এতক্ষন কথাগুলো বলছিল শাকিল। তার মায়ের অনেক কঠিন একটি রোগ হয়েছে। এতদিন কেউ এটাকে আমলে নেয় নি। কিন্তু আজ একটু আগেই শাকিলের মা রান্না করতে গিয়ে রান্না ঘরে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায়। তাই তারা সবাই ধরে তার মাকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছে। মায়ের মুখ থেকে প্রচুর ব্লাড বের হচ্ছে। শাকিল খুব ভয় পাচ্ছে। তবুও অবিরত তার মাকে স্বান্তনার সুর শুনিয়ে যাচ্ছে শাকিল। হ্যা, এটাই হয়ত মা ছেলের ভালোবাসা। একটু পরেই হাসপাতালে এসে থামল এম্বুলেন্স। শাকিল তারাতাড়ি করে নেমে একটা ট্রলি নিয়ে এসে তাতে উঠিয়ে ভেতরে নিয়ে যাচ্ছে। আর টুসি একজন নার্সকে ডাকতে আগেই ভিতরে চলে গিয়েছে। টুসি, শাকিকের বউ। এইতো মাত্র দুমাস হল তাদের বিয়ে হয়েছে। মা প্রায়ই অসুস্থ থাকে তাই তার সেবাযত্ন করার জন্যই তার বিয়ে করা।
শাকিল মায়ের একমাত্র সন্তান। বাবা মারা গেছে বছর খানেক হল। তার পর থেকেই মা কেমন যেন অসুস্থ হয়ে গেছেন। মাকে নিয়ে খুব চিন্তিত থাকে সে। সে কারনেই এত তারাতাড়ি বিয়ে করেছে সে। সে, টুসি( তার স্ত্রী), আর তার মা এই নিয়েই তাদের ছোট্ট সংসার। খুব বেশি আয় যেমন তাদের নেই তেমনই খুব বেশি ব্যায়ও নেই তাদের। শাকিল কোন চাকরি বাকরি করে না। এখনো পড়াশোনা করছে সে। অনার্স ফোর্থ ইয়ারের ছাত্র সে। পাশ করে চাকরি খুজবে সে। টুসিও এখনো পড়াশোনা করছে। শাকিলের বাবা একজন পুলিশ অফিসার ছিলেন। তিনি একটা চারতলা বাড়ি করে গেছেন শহর এলাকায়। সেই বাড়ি ভাড়ার টাকা দিয়েই চলে তাদের সংসার। শাকিল আর দুজনেই পড়াশোনা করে বলে তার মা তাকে ও টুসিকে মোটেও কোন কাজ করতে দেন না। সংসারের সকল কাজ তিনি একা হাতেই করেন। আজ সকালে রান্না করার সময়েই তিনি হটাৎ অজ্ঞান হয়ে যান। তার পরেই টুসি ও শাকিল দুজনে মিলে এম্বুলেন্স এ করে জেলা সদর হাসপাতালে নিয়ে যান তার মাকে।
এখন উনি হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছেন। একটু পরেই দেশের একজন নামকরা ডাক্তার আসবেন। উনিই দেখবেন শাকিকের মাকে। শাকিল ফোনে সব বলে রেখছিল ডাক্তারকে। ডাক্তার এসেই ক্যাবিনে ডুকল শাকিলের মাকে দেখতে। ডাক্তার দেখলেন প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে রোগীর। এক্ষুনি রক্ত না দিতে পারলে বাচানোই যাবেনা তার মাকে। শাকিলকে ডেকে ডাক্তার বলল ১ ঘন্টার মধ্যে ৩ ব্যাগ রক্ত লাগবে নয়ত বাচানো যাবে না রোগীকে। কথাটা শুনেই শাকিলের মাথা ঘুরে গেল। এই এত কম সময়ের মধ্যে কি করে জোগাড় করবে সে ৩ ব্যাগ রক্ত। কে দেবে তাকে এখন রক্ত৷
সে দৌড়ে হাসপাতালের ব্লাড ব্যাংকে গেল। তার মায়ের AB- রক্তের প্রয়োজন। সেখানের স্টাফ জানাল তাদের কাছে এই মুহুর্তে AB- রক্ত নেই। সে অস্থির হয়ে গেল। কিছু না ভেবে পেয়ে ফোন করল তার ছোট কাকাকে। কাকা দেশের বাইরে। তার চেনা পরিচিত সকলকেই সে একে একে ফোন দিল। তার ছোট খালা, পিসি, মামা, দূরসম্পর্কের দাদু, দিদা সবাইকে। কারোও রক্তই তার মায়ের সাথে ম্যাচ করে না। কি হবে এবার। তার মাকে তো যে করেই হোক বাচাতে হবে। মা ছাড়া আর কেউ নেই তার এই দুনিয়াতে । মাও চলে গেলে সে বাচবে কি করে। হটাৎ তার এক বন্ধুর কথা মনে পড়ল সে জানে তার সেই বন্ধুর রক্তের গ্রুপ তার মায়ের সাথে ম্যাচ করে। দৌড়ে গেল তার সেই বন্ধুর কাছে।
শাকিলঃ আমার মা হাসপাতালে, তোর রক্তের গ্রুপ তো AB- । প্লিজ একটু রক্ত দিবি আমার মাকে। উনি এখন হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে। দে না প্লিজ। আমি সারাজীবন তোর গোলামি করে যাব প্লিজ বাচা দোস্ত আমার মাকে।
কাদতে কাদতে সাব্বিরের সামনে হাটু গেড়ে বসে হাত জোর করে মিনতি করতে করতে কথাগুলো বলছিল শাকিল।
শাকিলঃ ধুর বেটা, এই অসময়ে ডিস্টার্ব করিস না তো। একটু পড়েই আমাকে রিতাকে নিয়ে মার্কেটে যেত্ব হবে। ও ঘরে রেডি হচ্ছে। তুউ যাতো এখন এখান থেকে। এই বলে পা দিয়েই ঠেলে ফেলে দিল শাকিলকে। শাকিল চোখের জল মুছতে মুছতে উঠে দাড়াল। আর কল্পনায় চলে গেল সেই তিন বছর আগের গল্পে।
শেষটা তো এখানেই, কিন্তু শুরুটা তো অন্য কোথাও....
((তিন বছর আগের কথা)
শাকিল শবে মাত্র ভর্তি হয়েছে ভার্সিটিতে। আজ তার প্রথম ক্লাস। ভার্সিটির জন্য রেডি হচ্ছে সে। ওদিকে তার মা নাস্তা বানাচ্ছে। নাস্তা খেয়েই রওনা দিল সে। ভার্সিটিতে প্রথম তার যেই ছেলেটার সাথে প্রথম পরিচয় হয় সেই ছেলেটার নাম সাব্বির। সাব্বির খুব ব্রিলিয়ান্ট একটা ছেলে। খুব ভালো। কিছুদিনের মধ্যেই তাদের মধ্যে গভির বন্ধুত্ব গড়ে উঠে। একে অপরের পরিপুরক এর মত। এভাবেই কেটে গেল ছয় মাস। একদিন সকালে হটাৎ সাব্বির ফোন দিয়ে শাকিলকে দ্রুত দেখা করতে বলে। দুজনেই লেকের পারে দেখা করে যেখানে তারা বসে আড্ডা দিত। সাব্বির এসেই তার পায়ে পড়ে গেল। শাকিল অনেকটা অবাক হয়ে গেল। কি হয়েছে আজ ওর। সাব্বিরকে তুলে বলল কি হয়েছে তোর। সাব্বির কাদতে কাদতে শাকিলকে বলেছিল, "দোস্ত, আমার মা খুব অসুস্থ। হাস্পাতালে ভর্তি। ডাক্তার বলেছে জরুরী ১ ব্যাগ রক্ত লাগবে। তোর তো A+ , প্লিজ দোস্ত আমার মাকে তুই বাচা প্লিজ। " শাকিল ধমকের সুরে বলল ক কস ব্যাটা। আমি পারব না দোস্ত। তার উপর আমার রক্ত দিলে ভয় লাগে। আমি পারব না তুই অন্য কোথাও দেখ। সাব্বির সেদিন শতবার বলেও রাজি করাতে পারেনি শাকিলকে। একটু পরেই সাব্বিরের মা মারা যায়। খবরটা পেয়েই শাকিলকে ফোন করে সে। জানায় তার মায়ের মৃত্যুর খবরটা। সাথে এটাও বলে আজ থেকে তোর কাছে আর কিছুই চাওয়ার থাকবে না আমার। আর কোনদিন বিরক্ত করব না তোকে। সেদিনের পরই সাব্বির ভার্সিটি চেঞ্জ করে অন্য জায়গায় চলে যায় সে।
(আবার বর্তমানের গল্প)
কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে তার। মনে মনে বলল সাব্বিরেরই কি বা দোষ, আমার জন্যই তো তার মা মারে গেছে। আমিই তো বড় পাপী। সেদিন যদি আমি তার মাকে বাচাতাম তাহলে আজ আমার মাও বেচে থাকতে পারতেন। এগুলো ভাবছে আর কাদছে সে। হটাৎ মনে পড়ল তার মায়ের কথা। একঘন্টা তো হয়ে গেছে। এতক্ষণে নিশ্চয়ই তার মা খোদার কাছে তাকে চিরতরে ছেড়ে চলে গেছে। খুব কাদছে সে। হটাৎ টুসির ফোন।
টুসিঃ হ্যালো, শাকিল। তুমি এক্ষুনি হাসপাতালে চলে এস তারাতাড়ি।
শাকিল এক দৌড়ে হাসপাতালে গিয়ে পৌছুলো। হাসপাতালে পৌছেই সে দেখে তার মা তাকে ডাকছে। শাকিল হতবাক হয়ে গেল। আনন্দে শাকিবের চোখ ছল ছল করছে। মাকে জড়িয়ে ধরে ইচ্ছামত কাদল সে। মাকে সে আবার জড়িয়ে ধরতে পারবে এটা তার কল্পনাতেও ছিল না। নিজেকে সামলে নিয়ে ডাক্তারকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানাল সে। ডাক্তার মৃদু হেসে বললেন ধন্যবাদ আমাকে নয় তাকে দাও যে তোমার মাকে রক্ত দিয়েছে। শাকিলের মাথায় যেন কিছুই ঢুকছে না। চোখ মুছে সে টুসিকে জিজ্ঞাস করল রক্ত কে দিয়েছে। টুসি দরজার দিকে হাত দিয়ে কাকে যেন দেখালো। শাকিল দেখতে পেলে এতো আর কেউ নয় তার সেই পুরনো বন্ধু সাব্বির। ছুটে গিয়ে সাব্বিরের পায়ে পড়ে যায় শাকিল। সে এ উপকারের কৃতজ্ঞতা জানানোর ভাষা খুজে পাচ্ছে না। অবশ্য এই অতুলনীয় উপকারের কৃতজ্ঞতা জানিয়ে সে তাকে ছোট করতেও চায় না। তিন বছর আগে তার রক্ত না দেয়ার কারনে যার মা মারা গেছিল, আজ তারই দেয়া রক্তের কারনে তার মা বেচে গিয়েছে। এ কৃতজ্ঞতা সে কি করে জানাবে।
সাব্বির কিছুই বলল না। যাবার পুর্বে একটা চিরকুটে কিছু কথা লিখে গেছিল।
কথগুলো এরকম, " রক্ত আমাদের শরীরের অতি প্রয়োজনীয় বস্তু। এটার ঘাটতি হলে মানুষ বাচতে পারে না। সেহেতু আপনার সামান্য রক্ত দেয়ার কারনে যদি এরকম হাজারো মা, বাবা, ভাই, বোন বেচে যায় তাহলে ক্ষতি কি। আসুন আমরা সকলে রক্তদানে এগিয়ে আসি আর এরকম হাজারো পরিবারের মুখে হাসি ফোটাই। একটা কথা মনে রাখবেন সবসময়,
"প্রয়োজনটা আজ তার, কিন্তু এমনও হতে পারে একদিন সে হবে আপনার প্রয়োজন। আজ আপনি তার পাশে থাকলে সেদিন সে আপনার পাশে থাকবে। "
সেদিনের পর থেকে শাকিল আর সাব্বির দুজনেই প্রতিদিন হাসপাতালে হাসপাতালে ঘুরে ঘুরে দেখে আর বলে কার রক্ত লাগবে আমি দেব, কার রক্ত লাগবে আমি দেব।
আসুন আজ থেকে আমরা অন্তত একটি কথা নিশ্চিত করি," যেন কেউ কোথাও অন্তত রক্তের অভাবে মারা না যায়। "। এই কথাটা নিশ্চিত করতে হবে আমাদের। তবেই একটা সুন্দর সমাজ গিড়ে উঠবে।
এটা গল্প হলেও সমাজের শেষটা যেন এই গল্পের মতই সুন্দর হয়।
সকলের উদ্দেশ্যে কিছু কথা
যারা দূর দুরান্ত থেক রক্ত দিতে যান, তারা কেউ হয়ত ছাত্র, কেউ হয়ত চাকরিজীবী। সেই ব্যাক্তিটি আপনার পরিবারের একজনকে বাচাতে যদি এত দূর গিয়ে নিজের রক্ত দিতে পারে মনে রাখবেন তার প্রতি আপনারও কিছু দায়িত্ব রয়েছে। নিচে বলা কথাগুলো পালন করতে চেস্টা করবেন ইনশাআল্লাহ।
১.রক্তাদাতার যাতায়াতের ব্যায় আপনি বহন করুন
২. রক্তদাতার সহিত ভালো ব্যাবহার করুন
৩. রক্ত দেয়া শেষে তাকে কিছু ফলমূল কিনে দিন আপনার সাধ্য অনুযায়ী।
ভালোবাসায় ভরে উঠুক সকল পরিবার।
গল্পঃ রক্তপ্রাণ
লেখকঃ মোঃ সাব্বির হোসেন


Post a Comment