বাবা মেয়ের ইফতার || মানবিক গল্প || মোঃ সাব্বির হোসেন
আজ প্রথম রোজা। সন্ধ্যা প্রায় হয়ে এল প্রায়। ইফতারের সময় হয়ে গিয়েছে। ইফতারের বাকী আর মাত্র ২৫ মিনিট। আমাদের ঘরের সবাই রোজা। আম্মু আমাকে ১০০ টাকা দিয়ে বলল, যা বাবা দোকান থেকে গিয়ে জিলাপি আর বুরিন্দা নিয়ে আয়। বাকীসব ঘরেই বানাব। আম্মুর কাছ থেকে টাকাটা নিয়ে বের হলাম দোকানের উদ্দেশ্যে। রাস্তা দিয়ে যাবার সময় রাস্তার মোড়ে একজন ভিন্ন রকমের পুলিশ দেখতে পেলাম। একেতো সন্ধ্যা, তার উপর বিকেলে আবার বৃষ্টি হয়েছে। পরিবেশ সম্পুর্ণ ঠান্ডা। বড়োজোর তাপমাত্রা ২২ কি ২৩ হবে। অথচ তিনি মুখে লম্বা মাস্ক আর চোখে বড় করে একটা কালো সানগ্লাস। চুপ করে রাস্তার ধারে একটা উঁচু টিলার উপর বসে আছেন তিনি৷ দেখে বেশ অবাক হলাম আমি। কৌতুহল জাগল উনাকে নিয়ে জানার। পাশেই ইফতারের সামগ্রী বিক্রয়ের দোকান। বেশিক্ষন লাগবে না আনতে তাই ওখানে কিছুক্ষণ দাড়াব ভাবলাম এবং দেখব৷ উনি কেন এমন উদ্ভট সেজে রয়েছেন। পাশেই একটা বিশাল রেইনট্রি গাছ ছিল। গাছের আড়ালে গিয়ে দাড়ালাম। আমার থেকে তার দূরত্ব সর্বোচ্চ গেলে ২ মিটার হবে। হাতে ফোন নিয়ে টিপার ভান করলাম যেন বুঝতে না পারে আমি তার জন্যই এখানে দাঁড়িয়ে আছি। ইফতারের আর মাত্র ১৫ মিনিট আছে। হটাৎ তার ফোনে একটা ফোন আসে। উনি মোবাইলটা হাতে নিয়ে অনেক্ষণ তাকিয়ে থাকেন ফোনের দিকে। তারপর কি যেন ভেবে ফোনটা রিসিভ করলেন। ফোনের ওপাশ থেকে বোধহয় বলতেছিল, " বাবা, তুমি ইফতার করেছ। তোমাকে ছাড়া ইফতার করতে ভালো লাগছেন। " কথাটা আমার বোধ হল অনেক কষ্টে উনি শুনেছেন, এবং কিছু না বলে ফোনটা রেখে আকাশের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। আমি ভাবলাম হয়ত উনি কিছু ভাবছেন৷ পরক্ষণেই উনার মাথা নড়তে শুরু করা দেখে বুঝলাম না উনি কাদছেন। আর থাকিতে পারলাম না আমি। কাছে গেলাম উনার। গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম,"আংকেল, আপনি কাদছেন কেন। উনি আমাকে জড়িয়ে ধরে আরোও জোরে জোরে কেঁদে উঠলেন আর বললেন এসব তুই বুঝবি না বাপ।" উনি আমাকে বলতে না চাইলেও আমি বুঝে নিয়েছিলাম উনার কষ্টটা। পরিবারের সাথে এবং এইবার প্রথম রোজা রাখা তার আদরের ছোট্ট মেয়েটার সাথে ইফতার না করতে পারার কষ্ট আর মেয়ে বাবাকে ফোন করে আক্ষেপের কথা জানানোর বিষয়টি হয়ত উনাকে ভিতরে জ্বালিয়ে দিচ্ছে। এটা শুধুমাত্র একজন বাবাই ভালো বুঝতে পারেন। উনাকে বললাম, আংকেল আমার বাসায় না একটা ঝামেলা হয়েছে, তুমি কি যাবে আমার সাথে। উনি সানগ্লাসটি খুলে চোখটি মুছলেন। এতক্ষনে তার ভেজা চোখ আমি দেখতে পেলাম । বসা থেকে উঠে রওনা দিলেন আমার সাথে। যাবার সময় দোকান থেকে ইফতার কিনে নিয়ে গেলাম। বাসায় গিয়ে আম্মুকে সব রেডি করতে বললাম। এতক্ষনে উনি হয়ত বুঝতে পেরেছেন আমি কেন উনাকে বাসায় নিয়ে এলাম। তবে এ নিয়ে আর কোন প্রশ্ন করেননি। ইফতারের বাকী আর মাত্র ৪ মিনিট। আমি উনাকে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনার বাসার নাম্বারটা দিবেন। আমি একটু কথা বলার ইচ্ছা পোষণ করলাম। উনি সাত পাচ না ভেবে দিয়ে দিলেন। আমি ফোন দিয়ে বুঝিয়ে বলে ডুয়ো কল দিলাম। মোবাইলটা উনার দিকে ঘুরাতেই উনার মেয়ে বলে উঠল, বাবা! মেয়েকে দেখে বাবা আর চোখের পানি ধরে রাখতে পারল না। কেদে দিল। অবশেষে একটা বাবা আজ তার মেয়ের সাথে ইফতার করতে পারল। আপাতত আমরা খাওয়াতে ব্যাস্ত। দোয়া করি পৃথিবীর প্রতিটি বাবার জন্য।
আল্লাহ হাফেজ
গল্পের নামঃ বাবা মেয়ের ইফতার
লেখকঃ মোঃ সাব্বির হোসেন


Post a Comment